ঈদে মিলাদুন্নবি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি

 প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২১, ১১:১০ পূর্বাহ্ন   |   সম্পাদকের কথা



আজ ১২ রবিউল আউয়াল। আমাদের প্রিয়তম নবি, সাইয়েদুল মুরসালিন হজরত মুহাম্মদ (স)-এর জন্মদিন। ওয়ালাদ আরবি শব্দ, অর্থাৎ জন্ম। সেই থেকেই মিলাদুন্নবি বা নবির জন্মদিন। আজ থেকে ১৪৫১ মতান্তরে ১৪৫২ বছর আগে মক্কার সম্ভ্রান্ত বংশে মা আমিনার কোল আলোকিত করে পৃথিবীতে এসেছিলেন পৃথিবী আলোকিত করা শ্রেষ্ঠ মানুষ হজরত মুহাম্মদ (স)। মক্কায় যখন অবিচার, অনাচার, নারী নির্যাতন, ধর্ষণ বীরত্বের ও শৌর্য-বীর্যের প্রতীক ছিল, সে সময়ের অবাদ সংস্কৃতির সমাজ তাকে আকর্ষণ করতে পারেনি। তিনি নিজেকে এসব পঙ্কিলতা থেকে দূরে রেখেছিলেন। অবক্ষয়ের সময়েও সমাজ গড়ার চিন্তায় তিনি হিলফুল ফুজুল সংঘে যোগ দিয়েছিলেন। রিসালাতের আগেই মক্কার বিদেশি ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিয়েছিলেন। মক্কার শ্রেষ্ঠ ব্যবসায়ী ও নারীকুলের শ্রেষ্ঠ অনুপ্রেরণাদায়ী খাদিজা (রা)-এর ব্যবসার তত্ত্বাবধানকারী হিসেবে মনোনীত হয়েছিলেন। পরে তার সততা ও ব্যক্তিত্বের কারণে নিজ উদ্যোগে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।


বিদূষী এই নারী তার নবুয়তের প্রথম স্বীকৃতিদানকারী। ঐশী দূতের ঝাঁকুনির ভয়ে জাম্মিলুনি জাম্মিলুনি বলে কাতর মানুষটির পাশে দাঁড়িয়ে শক্ত কণ্ঠে বলেছিলেন, আল্লাহ আপনাকে অপমাণিত করবেন না, আপনি আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সদাচরণ করেন, অসহায়-দুস্থদের দায়িত্ব বহন করেন, মেহমানদের আপ্যায়ন করেন এবং হক পথের দুর্দশাগ্রস্তকে সাহায্য করেন (কিতাবুল ওহি, বুখারি)। খাদিজার চাচাতো ভাই খ্রিষ্টান ধর্মের অন্যতম আলিম ওয়াকারা বিন নওফেল তার রিসালাতের সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ‘এ তো সেই দূত, যে আল্লাহর পক্ষ থেকে মুসা (আ)-এর নিকট এসেছিল।’ রসুল (স)-এর নবুয়তের স্বীকৃতির মাধ্যমে পৃথিবী এক আলোকবর্তিকার সন্ধান পেল। অন্য কথায় বলা যায়, আইয়ামে জাহেলিয়াতের (Day of Ignorance) ঘোর অন্ধকারে ডুবে থাকা জাতি আলোর সন্ধান পেল। সত্যিই এ ছিল এমন আলো, যা চাঁদের চেয়েও সুন্দর। মা আমিনার সঙ্গিনী বারাকাহ মুহাম্মদের জন্মের সময়ই বলেছিলেন, ‘মুহাম্মদ! চাঁদের চেয়েও সুন্দর।’ এই সুন্দরের ঢেউ পৃথিবীকে আরো সুন্দর করে তুলেছিল। তিনি আমার প্রিয় মুহাম্মদ, আহমদ মোস্তফা (স)। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায়, ‘ত্রিভুবনে প্রিয় মুহাম্মদ এল রে দুনিয়ায়/ আয় রে সাগর আকাশ-বাতাস দেখবে যদি আয়।’ রসুল (স)-এর এই স্বার্থক জন্মের মোহনায় এসে সব আলোর আঁধার খুঁজেছেন এই ধরিত্রীর সব মুক্তিকামী ও মানবতাবাদী মানবস্রোত। সারা পৃথবীর আধ্যাত্মিক বাদশাহ কবি জালালুদ্দিন রুমি রসুলপ্রেমের আলোয় মাতোয়ারা হয়েছেন। বলেছেন, ‘তোমার মধ্যে আলো থাকলে তুমি সত্য খুঁজে পাবেই। আর এ সত্যের মহা আলোর আধার আমার প্রিয় নবি (স)। (মসনবী) মহাকবি গ্যাটে লিখেছেন, ‘দেখ ঐ গিরি প্রস্রবণ আনন্দে উজ্জ্বল/ যেন তারার এক চমক মেঘের উপরে (ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ অনূদিত)। সারা পৃথিবীর দুর্গম পথ মাড়িয়ে আলোর পথের যাত্রীদের এক মহাকান্ডারি মানবতার মুক্তির দিশারি। কবির ভাষায়, ‘কাণ্ডারী এ তরীর পাকা মাঝি মাল্লা/ দাড়ি মুখে সারি গান লা শারিক আল্লাহ।’


রসুল (স)-এর প্রেম আর ভালোবাসায় কত আবেগী মানুষ জীবন অতিবাহিত করেছেন, এর কোনো হিসাব নেই। আর এই ভালোবাসার তালিকায় মুসলিম-অমুসলিম সবাই আছেন। রসুল (স) চল্লিশ বছর বয়সে সমগ্র বিশ্ব হেদায়াত তথা আলো হিসেবে যে কোরআন পেয়েছে, এর জন্য বিশ্ব সর্বকালে তার স্মরণ এককভাবে সবচেয়ে বেশি করেছে, এখনো করছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকবে। দিনদিন তার জন্ম, মৃত্যু, আনীত জীবনবিধান, মানবাধিকার, মানুষের মুক্তি ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় তার আলোচনা বাড়বে বই কমবে না। তার এই অবদানের জন্যই মিলাদুন্নবি নিয়ে এত আলোচনা। জন্ম তারিখ নিয়ে কিছু বিতর্ক থাকলেও অধিকাংশই একমত, ১২ই রবিউল আউয়াল সোমবার তিনি পৃথিবীতে এসেছিলেন। ইমাম আহমদ তার মুসনাদে ইবনে আব্বাস বলেন : ‘রসুল (স) সোমবার জন্মগ্রহণ করেন, সোমবার নবুয়ত লাভ করেন, সোমবারই ইন্তেকাল করেন। সোমবারে মক্কা থেকে হিজরত করে মদিনার পথে রওনা করেন, সোমবার মদিনায় পৌঁছান এবং সোমবারই তিনি হাজরে আসওয়াদ উত্তোলন করেন।’ (মসনদে আহমদ) হিজরি চতুর্থ শতক থেকে মিসরে মিলাদের আনুষ্ঠানিতা শুরু হলেও ইরবিলের শাসক আবু সাঈদ কুকবুরীর মাধ্যমেই এই উত্সবকে সুন্নি জগতে এবং সমগ্র মুসলিম বিশ্বে জনপ্রিয় ধর্মীয় উত্সবে পরিণত হয়। এজন্য বিভিন্ন সিরাতুন্নবি বিশেষজ্ঞ ও ঐতিহাসিকগণ তাকেই ঈদে মিলাদুন্নবির প্রবর্তক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। মুহাম্মদ ইবন ইউসুফ সালেহি শামী (মৃ. ৯৪২হি:) তাদের মধ্যে একজন। কুকবুরী ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম বীর সালাহ উদ্দিন আইয়ুবীর ভগ্নিপতী ছিলেন। তার ব্যাপারে এমন কথা প্রচলিত আছে যে সারা বছরই তার দরবারে রসুলের নামে দরুদ পড়া হতো আর তিনি ক্রন্দনরত থাকতেন। তারই অনুপ্রেরণায় আল্লামা আবুল খাত্তাব ওমর ইবনে হাসান ইবনে দাহিয়্ আল-কালবি সর্বপ্রথম ‘মিলাদুন্নবির’ ওপর গ্রন্থ রচনা করেন এবং এজন্য তিনি ১ হাজার দিনার স্বর্ণমুদ্রা উপঢৌকন পান। এর পর থেকে মিলাদুন্নবি উৎসব মূলত মুসলিম বিশ্বে প্রাতিষ্ঠানিকতা পায়, যা দিনদিন নতুন নতুন আবেদন নিয়ে আমাদের সামনে উপস্থিত হচ্ছে।


গ্লোবাল ভিলেজে মুসলিম বিশ্ব বিশ্বের সবকিছুর অংশীদার। পৃথিবীর এমন কোনো স্থান পাওয়া যাবে না, যেখানে মুসলমানদের উপস্থিতি নেই। বিশ্বের অর্থনীতি, শান্তি, মানবিকতাসহ মানবের প্রয়োজনীয় সবকিছুর সঙ্গেই মুসলমনরা জড়িত। মধ্যপ্রাচ্য তেল অর্থনীতিসহ বিশ্বের রাজনীতি ও পাওয়ার গ্রাউন্ড হিসেবে বিবেচিত। যে কারণে কেবল তাত্ত্বিকভাবে নয়, সারা পৃথিবীর মানুষ বাস্তবিকভাবেই মুসলমানদের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। যে কারণে সব ধর্ম-মত ও পথের লোকজন খুব নিবিড়ভাবে মুসলিম ঐতিহ্য ও ইতিহাসের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ পাচ্ছে। ইসলাম বিশেষ করে রসুল (স)-এর জীবন নিয়ে পশ্চিমা সমাজে যে ভ্রান্ত ধারণা সৃষ্টি হয়েছিল, তা দূরকরণে মুসলমানসহ অনেক ওরিয়েন্টাস্টি এগিয়ে এসেছিলেন, যারা এখনো কাজ করছেন। হরর মুভির পরিচালক খ্যাত মোস্তফা আক্কাদ ১৯৭৪ সালে হলিউড থেকে ‘দ্য মেসেজ’ মুভির মাধ্যমে পশ্চিমা সমাজে রসুল সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা অপনোদনে ব্যাপক ভূমিকা রাখেন। আমরা পিকে হিট্রি ও আরনল্ডের কথা ইতিহাসের বইয়ে পড়েছি, যারা পশ্চিমা বিশ্বে রসুলকে এক সত্যিকার নেতা হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছেন। ক্যারেন আর্মস্ট্রং এমনই একজন জীবিত ব্রিটিশ ওরিয়েন্টালিস্ট, যিনি ‘দ্য মুহাম্মদ’ বইয়ে রসুল (স)কে সত্যিকার মানবহিতৈষী সংস্কারক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এমন শত-সহস্র উদাহরণ এখানে আনা যাবে, যারা রসুল (স)-এর জন্মের মাধ্যমে পৃথিবী নবপ্রাণ পেয়েছিল বলে স্বীকার করেন।


বর্তমান পৃথিবীর এক-চতুর্থাংশ মানুষ এই মহানবির অনুসারি। মিলাদুন্নবিতে সবাই সমস্বরে বলে উঠবে, ‘ইয়া নবি সালাম আলাইকা/ ইয়া রসল সালাম আলাইকা’। কিন্তু অধঃপতিত ও ধ্বংসের কিনারায় হাবুডুবু খাওয়া মানুষকে যে আদর্শ দিয়ে রসুল কাছে টেনে নিয়েছিলেন, যে ভালোবাসায় একত্বের বাণীর মাধ্যমে মানুষকে দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করেছিলেন, নারীদের সসম্মানে অধিষ্ঠিত করেছিলেন, অন্য ধর্ম ও বিশ্বাসের মানুষের অধিকার ও মর্যাদা সমুন্নত রেখেছিলেন, সারা বিশ্বের প্রেক্ষাপটে অন্যদের কথা বাদ দিলাম, আমরা মুসলমানেরা এর কতটুকুু জানি এবং মানি? পত্র-পত্রিকা খুললেই হত্যা, ধর্ষণ, নারী নির্যাতন, দুর্নীতির প্রতিবেদন দেখতে দেখতে চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। আর সংখ্যালঘু নির্যাতনের কথা বলতে গিয়ে তো লজ্জায় মাথা নুয়ে যায়। সদ্যসমাপ্ত দুর্গাপূজায় কুমিল্লাসহ সারা দেশে যা হয়েছে, এর দায় কি রসুলের উম্মত হিসেবে আমরা এড়াতে পারব? যে রসুল (স) বলেছেন, ‘মুসলিম দেশে অমুসলিমরা আমানত। কোনো অমুসলিমের সঙ্গে অন্যায় আচরণ করলে আমি তার বিরুদ্ধে দাঁড়াব।’ আমরা কি এই আমানত রক্ষা করছি? ধর্মের নামে বা রাজনীতির নামে যেভাবেই এসব অনৈসলামিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে বেআইনি কর্ম করা হোক, তাতে শুধু যে আইন আর ধর্মের অবমাননা হচ্ছে তা নয়, বিশ্ববাসীর কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি প্রচণ্ডভাবে ক্ষুণ্ন হচ্ছে। কোরআনের ভাষ্য ‘আল্লাহকে বাদ দিয়ে তারা যাদের ডাকে, তোমরা তাদের গালি দিও না, তাহলে তারা অজ্ঞতাবশত অন্যায়ভাবে আল্লাহকেও গালি দেবে’ (৬:১০৮) এরূপ স্পষ্ট নির্দেশনা থাকতে কোনো একজন ধর্মপ্রাণ মুসলমান কোনো হিন্দুর মূর্তিতে আঘাত তো দূরের কথা আঘাতের কথা চিন্তাও করতে পারে না। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী প্রায়শই মদিনার সনদে দেশ চালানোর কথা বলেন। দেশের একজন নাগরিক হিসেবে আমার দাবি, বারবার এসব ঘৃণ্য তত্পরতা আর বরদাশত করা যায় না। আপনি রসুলের আদর্শের অবমাননাকারীদের তদন্তের মাধ্যমে স্বরূপ উন্মোচন করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনুন, যা দেখে আর কেউ দ্বিতীয়বার এরূপ ঘৃণ্য কর্মে নিজেকে জড়াবে না। মিলাদুন্নবির এই দিনে আসুন আমরা একটি প্রতিজ্ঞা করি—রসুলের নীতি-দর্শনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে বাংলাদেশকে সব মানুষের জন্য আবাসযোগ্য হিসেবে গড়ে তুলি। এ দেশের হাজার বছরের ঐতিহ্য রক্ষা করি। কবির ভাষায়, রসুল সমীপে আমার আরজি, ‘তোমার বাণীকে করিনি গ্রহণ/ ক্ষমা করো হযরত/ ভূলিয়া গিয়াছি তব আদর্শ/ তোমার দেখানো পথ/ ক্ষমা করো হযরত’। ক্ষমাই হোক আমার জীবনের পাথেয়।

সম্পাদকের কথা এর আরও খবর: