করোনার মধ্যে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিতে বড় স্বস্তি

 প্রকাশ: ০৩ অগাস্ট ২০২১, ০৯:৩৩ পূর্বাহ্ন   |   জাতীয়


বাংলাদেশের বিকাশমান অর্থনীতির দুই বৃহৎ স্তম্ভ হচ্ছে রপ্তানি ও অন্তর্মুখী রেমিট্যান্স। অতীতের মতো এবারও ঈদের আগে রেমিটেন্সের ঊর্ধ্বগতি ছিল। তবে ঈদের পরে একটু কমেছে।  করোনার মধ্যে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিতে বড় স্বস্তি এনে দিয়েছে। এই কারণে দেশের ব্যাংকগুলোতে আমানত বেড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি পাচ্ছে। গ্রামীণ জনপদে থাকা প্রবাসীদের স্বজনেরা করোনার আর্থিক প্রভাব থেকেও রেহাই পাচ্ছেন। করোনাভাইরাসের ধাক্কায় বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশের অর্থনীতি কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু এ খারাপ সময়েও অর্থনীতিতে সুবাতাস ছড়িয়েছে প্রবাসী আয়। খারাপ সময়েও প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স কমেনি, বরং বেড়েছে।
 গতকাল সোমবার (২ আগস্ট) প্রকাশিত বাংলাদেশ ব্যাংকের সবশেষ প্রতিবেদনে জানা গেছে,  আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে রেমিটেন্স কমেছে ৩৯ শতাংশ। গেলো মাসে ১৮৭ কোটি ১৫ লাখ ডলার দেশে পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। ২০২০-২১ অর্থবছরের জুলাইয়ে পাঠিয়েছিলেন ২৫৯ কোটি ৮২ লাখ ডলার।  সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরের শেষ মাস জুনে দেশে ১৯৪ কোটি ৮১ লাখ ডলার পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। মে মাসে দেশে এসেছে ২১৭ কোটি ডলারের রেমিটেন্স। এপ্রিলে ২০৬ কোটি ৬৪ লাখ ডলার, মার্চে ১৯১ কোটি ৯৮ লাখ ডলার, ফেব্রুয়ারিতে এসেছে ১৭৮ কোটি ৬০ লাখ এবং জানুয়ারি মাসে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন ১৯৬ কোটি ৯১ লাখ ডলার।  
বিদায়ী অর্থবছরে দেশে সব মিলিয়ে প্রবাসী আয় এসেছে ২ হাজার ৪৭৭ কোটি ৭৭ লাখ ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা (প্রতি ডলার ৮৫ টাকা ধরে)। এই আয় এর আগের ২০১৯-২০ অর্থবছরের ১ হাজার ৮০৩ কোটি ১০ লাখ ডলারের চেয়ে ৩৬ শতাংশ বেশি এবং ২০১৬-১৭ অর্থবছরের তুলনায় দ্বিগুণ। এদিকে বিদায়ী অর্থবছরে পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে মোট আয় হয়েছে ৩ হাজার ৮৭৬ কোটি ডলার। অর্থাৎ, প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো অর্থ রপ্তানি আয়ের অনেকটা কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছে। ফের রেমিটেন্স প্রবাহ আগের ধারায় ফিরবে বলে আশা করেন  বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম। 



 বিদেশ থেকে প্রেরিত অর্থের বেশির ভাগ উপকারভোগী যেহেতু গ্রামে থাকেন, তাই বাংলাদেশের অনেক গ্রামের চেহারা বদলে দিয়েছে প্রবাসী আয়। সব মিলিয়ে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ যেন এখন অর্থনীতির বড় শক্তি হয়ে উঠেছে। জমিজমা বিক্রি করে পরিবার-পরিজন ছেড়ে বিদেশে পড়ে থাকা মানুষগুলোর পাঠানো বিদেশি মুদ্রায়ই এখন দেশের বেশির ভাগ আমদানি দায় মেটানো হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও বড় হচ্ছে সেই অর্থে। আগে টাকা পাঠাতে অনেক দূরে যেতে হতো। এখন আশপাশের বিভিন্ন এক্সচেঞ্জ হাউস থেকেই টাকা পাঠানো যায়। এ জন্য প্রতি মাসেই তাঁরা এখন টাকা পাঠান। পরিবারের সদস্যরা বাড়ির পাশের এজেন্ট ব্যাংকিং থেকে টাকা পেয়ে যাচ্ছেন।  দেশে কার্যরত সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকগুলো প্রায় নিজেদের উদ্যোগেই রেমিট্যান্স আসার পথ অনেক সহজ করেছে। তারা এ জন্য বিদেশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিও করেছে। কোনো কোনো ব্যাংক আবার বিভিন্ন সময় কর্মী পাঠিয়ে প্রবাসী আয় সংগ্রহ করেছে। বাংলাদেশি প্রবাসী-অধ্যুষিত অঞ্চলে ইসলামী ব্যাংকসহ কিছু ব্যাংকের বিদেশে নিজ নামে শাখা-উপশাখাও রয়েছে। প্রবাসী আয় বিতরণে এখন ব্যাংক শাখার পাশাপাশি এজেন্ট ব্যাংকিং, মোবাইল ব্যাংকিং ও বেসরকারি সংস্থাও কাজ করছে। ফলে বিদেশ থেকে পাঠানো রেমিট্যান্স দ্রুততম সময়ে সরাসরি চলে যাচ্ছে প্রবাসীদের স্বজনদের কাছে। এটি আবার সরকারের অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নীতির ও একটি বিরাট লক্ষ্য।

 প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রাখতে প্রবাসী আয়ে প্রণোদনা বাড়িয়ে দ্বিগুণ করতে অর্থ মন্ত্রণালয়কে প্রস্তাব করেছে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়।  বৈধ পথে প্রবাসী আয়ের ধারাটি অব্যাহত রাখতে পারলে এবং আরও বেগবান করতে পারলে রেমিট্যান্স প্রবাহের বর্তমান ধারা অদূর ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। তাই প্রবাসীদের উৎসাহী করতে বিদ্যমান ২ শতাংশের প্রণোদনা বাড়িয়ে ৪ শতাংশ করা যেতে পারে। এ খাতে সরকারের অতিরিক্ত ৪ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। এটি সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা খাতের ব্যয় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। 

করোনা মহামারির কারণে কাজ হারিয়ে ইতিমধ্যে প্রায় পাঁচ লাখের বেশি বাংলাদেশি অভিবাসী কর্মী দেশে ফেরত আসতে বাধ্য হয়েছেন। এর প্রায় ৬৩ শতাংশ অভিবাসী কর্মীকে পাওনা বেতন, বোনাস বা গ্র্যাচুইটি না দিয়েই সম্পূর্ণ শূন্য হাতে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। প্রবাসী শ্রমিকদের বেশির ভাগ অবকাঠামো নির্মাণসহ নানা রকম কাজে যুক্ত ছিলেন। করোনায় অনেক দেশেই এসব কাজের চাহিদা কমে গেছে। এ কারণে অনেক প্রবাসী শ্রমিককে দেশে ফিরে আসতে হয়েছে। তাঁদের অনেকেই পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। ফলে শুধু ফেরত আসা শ্রমিকই নন, পুরো পরিবারই সমস্যায় পড়েছে। 


গত বাজেটে অভিবাসীদের উন্নয়নে রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ের ১০ শতাংশ বরাদ্দের দাবি জানিয়েছিলো  অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রাম (ওকাপ)। তারা বলছে, প্রবাসী আয় দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও তৃণমূল পর্যায়ে মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখলেও অভিবাসী কর্মীদের অধিকার, কল্যাণ ও সুরক্ষার ব্যাপারে এখন পর্যন্ত রাষ্ট্রের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বিদেশফেরত অভিবাসী কর্মীদের, বিশেষ করে নারী অভিবাসী কর্মীদের জাতীয় ‘সামাজিক সুরক্ষা বেষ্টনীতে’ অন্তর্ভুক্ত করে মাসিক ভাতা প্রদানের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। অভিবাসী কর্মীদের সুরক্ষার জন্য ‘সোশ্যাল বেনিফিট’ নিশ্চিত করতে ‘প্রভিডেন্ট ফান্ড’ চালু করতে হবে। প্রবাসী আয়ের ওপর প্রণোদনা ২ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫ শতাংশ করতে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে।