সাবাস কিশোয়ার : বাঙালি খাবারের বিশ্বজয়

 প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২১, ০৩:৫৮ অপরাহ্ন   |   সম্পাদকের কথা



অস্ট্রেলিয়ার রিয়েলিটি শো মাস্টারশেফের ত্রয়োদশ আসরে অংশ নিয়ে দ্বিতীয় রানার-আপ হয়েছেন বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত অস্ট্রেলিয়ান নারী কিশোয়ার চৌধুরী। প্রতিযোগিতার বিভিন্ন স্তরে পান্তা ভাত, আলু ভর্তার মতো একের পর এক বাঙালির শেকড়ের রান্না পরিবেশন করে বিচারকদের মন জিতেছেন কিশোয়ার। কিশোয়ার বন্দনায় এখন ভেসে যাচ্ছে মিডিয়া ও নেটদরিয়া।

অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া রাজ্যের বাসিন্দা কামরুল চৌধুরী ও লায়লা চৌধুরীর মেয়ে কিশোয়ার চৌধুরী। ডাক নাম নুপুর। মেলবোর্ন শহরে কিশোয়ার চৌধুরীর জন্ম ও বেড়ে ওঠা। পেশায় তিনি বিজনেস ডেভেলপার। পরিবারিক প্রিন্টিং ব্যবসাও দেখভাল করেন। দুই সন্তানের মা কিশোয়ার শখের রাধুঁনী। পেশাদার রান্নার কোনো কোর্স করেননি। সন্তানদের জন্য রাঁধতে গিয়ে মা-বাবার কাছ থেকেই শিখেছেন নানা পদের দেশীয় রান্না।


কামরুল চৌধুরী সমাজসেবার জন্য অস্ট্রেলিয়ার রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘অর্ডার অব অস্ট্রেলিয়া’ পাওয়া নিবেদিত প্রাণ সংগঠক ও ব্যবসায়ী। তাঁর আদি বাড়ি ঢাকা। সত্তর দশকের প্রথম দিকে তিনি অভিবাসী হয়ে অস্ট্রেলিয়ায় আসেন। রান্নার প্রতি ঝোঁক থাকায় দেশে থাকতেই কামরুল চৌধুরী পুরান ঢাকার বিভিন্ন বাহারী খাবারের রেসিপি রপ্ত করে ফেলেছিলেন। মেলবোর্নে বাংলাদেশ সমিতির বড় বড় অনুষ্ঠানে শখ করে তিনি নিজেই রান্না করেন। মাস্টার শেফের সেমিফাইনালে বাবার রেসিপি দিয়ে নেহারী রান্না করে বাজিমাত করেন কিশোয়ার।

কিশোয়ার অস্ট্রেলিয়াতে বেড়ে উঠলেও কথা বলেন সাবলীল বাংলায়, আর হৃদয়ে ধারণ করেন বাংলাদেশ। ছোটবেলা থেকে তিনি মেলবোর্নের বাংলাদেশ সমিতির সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে নিয়মিত অংশ নিতেন। স্থানীয় বাংলাদেশী নাট্যদলের একটি নাটকেও তিনি অভিনয় করেছেন।

বাংলাদেশী খাবার বিশ্বের দরবারে তুলে ধরাটাই ছিল কিশোয়ারের মাস্টারশেফে অংশ নেয়ার মূল লক্ষ্য। যে কারণে প্রতিযোগিতার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নিষ্ঠা ও সততার সাথে তিনি বিভিন্ন পদের বাংলাদেশী খাবার পরিবশেন করে গেছেন। এ চাট্টিখানি কথা নয়। এ জন্য প্রয়োজন আত্মবিশ্বাস, অদম্য সাহস ও স্বদেশী সংস্কৃতির জন্য নির্ভেজাল ভালোবাসা।


বিশ্বের বড় বড় শহরে বাংলাদেশী মালিকানাধীন বহু রেস্তারাঁ থাকলেও, খাবারের টেবিলে দেশীয় খাবারের বদলে মূলত ‘ইন্ডিয়ান ফুড’ পরিবেশন করা হয়। এভাবে ভারতীয় খাবারের আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশী খাদ্য। ইংল্যান্ডে রয়েছে আমাদেরই একজন, কারি কিংখ্যাত টমি মিয়া। টমি মিয়া চাইলে হয়তো স্বদেশের খাবারগুলো ইংল্যান্ডের মূলধারার মানুষের কাছে তুলে ধরতে পারতেন। কিন্তু সেই ঝুঁকি তিনি নেননি। তবে কিশোয়ার ব্যতিক্রম। বেগুন ভর্তা, কালি জিরা মাখা যাউ ভাত নিয়েও যে একটি বিশ্বমানের রান্নার রিয়েলিটি শোতে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো যায়, গর্ব করা যায়, সেটা প্রমাণ করে দিলেন কিশোয়ার। এজন্যই কিশোয়ারকে সেল্যুট করতে ইচ্ছে করে বারবার।



মাস্টারশেফ প্রতিযোগিতার শুরুতে তিনি তৈরি করেছিলেন আম দিয়ে মাছের ঝোল আর বেগুন ভর্তা। এরপর পরিবেশন করেন খিচুড়ী, লাউ-চিংড়ি, কুমড়া ভাজি, মাছ ভূনা, যাউ ভাত, ফুচকা, চটপটি, আলুর দম, খাসির রেজালা ও পরোটার মতো একের পর এক মুখরোচক খাবার। কিশোয়ারের মাছের ঝোল, মাষ্টারশেফ বিচারকদের চেটেপুটে খাওয়াটাই প্রমাণ করে দেয় আমাদের শেকড়ের খাবারগুলোও বিশ্বমানের।


 
প্রতিযোগিতার সেমিফাইনালে কিশোয়ার রেঁধেছেন নেহারীর মতো ঐতিহ্যবাহী জটিল পদ। তবে শেষে পানের মোড়কে তৈরি ডেজার্ট ছিল কিশোয়ারের মাস্টার স্ট্রোক, যা তাঁকে নিয়ে যায় গ্র্রান্ড ফাইনালে। পানের সঙ্গে আইসক্রীম মিশিয়ে কিশোয়ারের তৈরি অভিনব ডেজর্টি ‘দি বেঙ্গলি আফটার ডিনার মিন্ট’ দেখে চমকে উঠেছিলাম। বিচারকদের অদ্ভূত ভঙ্গীমায় পান খাওয়া দেখে মনে পড়ে যাচ্ছিল শেফালী ঘোষের গাওয়া বিখ্যাত গান- বক্সির হাটের পানের খিলি তারে বানাই খওয়াইতাম!

এরপর গ্রান্ড ফাইনালের প্রথম দিন মারাত্মক ঝুঁকি নিলেন কিশোয়ার। পরিবেশন করলেন আমাদের প্রাণের উৎসব বৈশাখের প্রতীকি খাবার পোড়া মরিচ দিয়ে পান্তা ভাত, যা তিনটি বিচারকের কাছেই পেলো দশে দশ। পান্তাভাত আমরা কৃষকের খাবার বলে অনেকেই অবজ্ঞা করি। বৈশাখের সময় আবার ফ্যাশন করে পান্তা ইলিশও খাই। কিন্তু এই পান্তা ভাতকেই ফাইন ডাইনিংয়ের মেন্যুতে তুলে এনে কিশোয়ার দিলেন শৈল্পিক মাত্রা।

কিশোয়ার এখন বিশ্বে বাঙালির একটি প্রিয় এবং সাড়া জাগানো নাম। অস্ট্রেলিয়ায় বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের যেসব ছেলেমেয়েরা বাঙালি খাবার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছিল, শুনলাম তারাই এখন লাউ-চিংড়ি ও আলু ভর্তা খেতে মায়ের কাছে বায়না ধরছে। নতুন প্রজন্মকে স্বদেশমুখী করার এই কৃতিত্ব কেবল কিশোয়ারের। এ অনেক বড় অর্জন।
কিশোয়ার একটি রান্নার বই লিখতে চান যা দেখে যে কেউ সহজেই বাংলা খাবার তৈরি করতে পারবেন। আমার বিশ্বাস, কিশোয়ারে এই বাধ ভাঙ্গা সাফল্যে আত্মবিশ্বাসী হয়ে প্রবাসের অনেক বাংলাদেশী ব্যবসায়ী তাদের রেস্তোরাঁয় বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী খাবার পরিবেশন করবেন। এভাবে হয়তো একদিন ইন্ডিয়ান ফুডের তকমা ঝেড়ে ফেলে স্বদেশের মুখরোচক খাবারগুলো স্বমহিমায় হাজির হবে বিশ্বের নামি-দামী রেস্তারাঁর টেবিলে।